সেরা কিশোর গল্প-লিও টলস্টয়

এবার(গতবার) কোরবানী ঈদের ছুটিতে বাসায় গিয়ে দেখি, ছোটভাই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটা বই এনে পড়া শেষ করে এখন ফেরত দিবে বলে নিয়ে যাচ্ছে। তার কাছ থেকে বইটা নিয়ে কয়েকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেললাম,তারপর আরকি তাকে পরের দিন ফেরত দিতে বলে চলে যেতে বললাম। বইটার নামঃ সেরা কিশোর গল্প-লিও টলস্টয়; সম্পাদনা-শহিদুল ইসলাম।

সত্যি কথা বলতে কী, আমি এর আগে লিও টলস্টয়ের কোন লেখা পড়িনি। বইটি পড়া শেষে আমি অনুভব করলাম, আমার আশ-পাশটা আরেকটু স্বচ্ছ এবং সহজ হয়ে গিয়েছে। বইটিতে মূলত যেসব গল্প আছে, সবগুলোতেই তিনি মানুষের সরলতা ও নৈতিকতার কথা বলেছেন। আর গল্পে যেসব সমস্যা বর্ণনা করে তার সমাধান করা হয়েছে, আমি অবাক হয়েছি সবকিছু আমাদের আশপাশে বিদ্যমান আমি প্রতিনিয়ত সেগুলো দেখি। তাহলে বুজলাম ক্যাঁচাল শুধু বাঙ্গালীরাই করে না, রাশিয়ার মানুষেরা ও করে।

লেখক সম্পর্কেঃ
                                                                                     Leo Tolstoy in 1897
লিও টলস্টয়(১৮৫২-১৯১০) একজন রাশিয়ান লেখক। তিনি শুধু রাশিয়ার না, পুরো পৃথিবীর অন্যতম বিখ্যাত ঔপন্যাসিক, দার্শনিক। রাশিয়ার লেখক লিওনিদ লিওনভ একবার বলেছিলেনঃ “আমাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে আমরা ধনী, কারণ আমরা টলস্টয়ের উত্তরপুরুষ।” লিও টলস্টয়ের অন্যতম দুইটা বিখ্যাত উপন্যাস হচ্ছে, War and Peace, Anna karenina।

আটটি গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে বইটি। যাক, গল্পগুলোর একটা রিভিও দেয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে………

[১] শিশুর সরলতাঃ এই গল্পের শেষ লাইন টা আমাকে অনেকক্ষণ ভাবিয়েছিল, লাইনটা এমন ছিল “শিশুর মতো সরল যে হতে পারবে না, তার ঠাঁই কখনো স্বর্গে হবে না।”

[২] মানুষ কি নিয়ে বাঁচেঃ এখানে দেবদূত ঈশ্বরের আদেশে পৃথিবীতে এসে তিনটা প্রশ্নের উত্তর আবিষ্কার করেছেন। যেগুলো আমাদের প্রতিদিনের প্রশ্ন, প্রতি মুহুর্তের প্রশ্ন এবং আমাদের সারাজীবনের প্রশ্ন। এক। মানুষের কি আছে? মানুষের প্রেম আছে। দুই । মানুষের কি নেই ? উক্ত গল্পের প্রসঙ্গ সাপেক্ষে উত্তরের লাইনটা এমন ছিল, “মানুষ একবছরের কথা ভাবে, অথচ সে জানে না যে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার আয়ু নেই।“ তিন। মানুষ কি নিয়ে বাঁচে? উক্ত লেখা থেকে, দেবদূত বললঃ “আমি জানলাম, মানুষ নিজের কোশল বাঁচে না, বাঁচে প্রেমে।”

[৩] মুরগির ডিমের মত বড় শস্যকণাঃ এই গল্পে মানুষের সততা, লোভের প্রভাব আলোচনা করা হয়েছে।

[৪] এক টুকরো রুটিঃ অধিক সম্পদের লোভ কখনোই ভাল না। শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে মানুষের সততা, নৈতিকতা ধ্বংস দেখানো হয়েছে এ গল্পে।

[৫] মানুষের ভালবাসাঃ ঈশ্বরের সৃষ্টি মানুষ। আর সে মানুষকে ভালবাসা যে ঈশ্বরকেই ভালবাসার ই আরেক রূপ। আহ! লেখক তার লেখনী শক্তি দিয়ে কত সুন্দরেই না উপস্থাপন করলেন।

[৬] ঈশ্বর সবই দেখতে পানঃ ঈশ্বরে বিচার ই সর্বোত্তম। আর মানুষকে সুপথে ফিরিয়ে আনার সর্বোত্তম উপায় তাকে ক্ষমা করে দেয়া।

[৭] কতটা জমি দরকারঃ আমি দেখি আমাদের আশপাশের অনেকেই টাকার নেশায় এতটাই মশগুল, আশপাশ এমনকি নিজের দিকে তাকানোর সময় ই তারা পান না। লোভের ভয়াবহতা লেখক লিখেছেন অতি সুন্দর ভাবে। গল্পের শেষ লাইনটা এমন ছিল, “পাখমের মাথা থেকে পা অবাধি কবরে শোয়াতে প্রয়োজন হল মাত্র ছ-ফুট জমি।”

[৮] আগুনের একটি কনাঃ এ গল্পটা পড়ে মনে মনে একটু হাসলাম, সস্তা ক্যাঁচাল শুধু বাঙ্গালীরাই করে না রাশিয়ানরাও করে। এই গল্পটা শুরু হয়েছে একটা মুরগীর ডিম কে কেন্দ্র করে দুটো মহিলার মধ্য থেকে আর তারপর দু বাড়ির দু পুরুষ জড়িয়ে ডিম থেকে যে ঘটনা কোথায় গেল, মনে হল লেখক যেন বাংলাদেশে এসেই আশ পাশ থেকে গল্পটা নিয়ে গেলেন। তবে শেষে লেখক তাদের জীবনে সুখ এনে দিতে গিয়ে যে সত্যটা দেখিয়ে দিলেন, তা হলো ক্ষমা।

এখানে লেখক মূলত সহজ কিছু ব্যাপার আলোচনা করেছেন, যা সবাই বুজবে এবং সবাই চোখ খুললেই দেখবে। কিন্তু এই সহজ ব্যাপারগুলো না জানার কারণেই জীবন এতটাই জটিল হয় যায়, কেউ কেউ অন্যকে মেরে ফেলে এবং এমনকি মেরে ফেলে নিজেকেও! অসম্ভব ভাল লেগেছে গল্পগুলো। যাক এখন দেখি সময় করে কবে আবার লেখকের দুটি বিখ্যাত উপন্যাস War and Peace, Anna karenina পড়া যায়। না অতি তাড়াতাড়ি ই পড়তে হবে। গল্পগুলো না পড়লে অবশ্যই অনেক কিছু মিস করতাম।

Facebook Comments

Author: Neoman Nasir

I am Neoman Nasir. Studied Applied Mathematics at Noakhali Science and Technology University.

One thought on “সেরা কিশোর গল্প-লিও টলস্টয়”

Leave a Reply