দি প্রফেট-খলিল জিব্রান

বইয়ের নামঃ দি প্রফেট – খলিল জিব্রান।
অনুবাদকঃ চৌধুরী মুশতাক আহমদ।

১৯২৩ সালে নিউইয়র্কে প্রকাশিত হয় লেখকের অতিন্দ্রীয়বাদী গদ্য-কবিতার সংকলন “দি প্রফেট” । জিব্রান তার সর্বশ্রেষ্ঠ এ রচনা বিষয়ে বলেন, “আমার ধারনা সেই লেবানন পর্বতে সর্বপ্রথম ‘দি প্রফেট’ এর কল্পনা আমার মাথায় আসার পর থেকে তা আমাকে আর ছেড়ে যায় নি। মনে হয় এ যেন আমারই এক অংশ; প্রকাশককে দেওয়ার আগে এর পান্ডুলিপি আমি চার বছর নিজের কাছে রাখি। কারণ আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম, আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম যে এর প্রতিটি শব্দ যেন আমার সর্বোত্তম যা দেওয়ার আছে ঠিক তা-ই হয়।”

লেখক সম্পর্কেঃ

Khalil Gibran

খলিল জিব্রানের পূর্বনাম জুবরান খলিল জুবরান। তার জন্ম লেবাননে ১৮৮৩ সালে এবং মৃত্যু নিউইয়র্কে ১৯৩১ সালে। আরব-খ্রিষ্টান বংশদ্ভুত আমেরিকা প্রবাসী জিব্রান ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার, কবি এবং চিত্রকর। তিনি আরবি ও ইংরেজি দুই ভাষায়ই লিখেছেন। ইংরেজিতে বের হওয়া দুটি বিখ্যাত বই হচ্ছে দি প্রফেট(১৯২৩) এবং স্যান্ড এন্ড ফোম(১৯২৬)। দুটিই পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে, তবে দি প্রফেট পেয়েছে বেশি।

বইটি প্রকাশের পর থেকে এর কোন না কোন মুদ্রণ বাজারে রয়েছে, অর্থাৎ এই পঁচাশি বছরে এটি কখনো দুষ্প্রাপ্য হয়নি। বলা হয়ে থাকে শেক্সপীয়র এবং চীনা কবি লাওজি-র পর জিব্রান হচ্ছেন ইতিহাসের তৃতীয় কবি যার বই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।(বইটির মুখবন্ধ অনুসারে) এখানে আমি বইটির রিভিও লিখছি না। বইটির অধ্যায় গুলো থেকে হুবহু কিছু বাক্য লিখে রাখছি, যেগুলো আমি আবার পড়বো এবং তারপর আবার পড়বো… যে গুলো পড়ে কিছুক্ষণ সত্য নিয়ে ভাবা যাবে। বইটির PDF Version এখানে পাওয়া যাবে।

[/] তাঁর জাহাজের আগমনঃ তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেন, বিচ্ছেদের দিন কি তবে মিলনেরও দিন? তাহলে কি বলব, আমার সন্ধ্যাই আসলে ছিল আমার সকাল?

[/] ভালবাসাঃ [] ভালবাসা যখন তোমাকে ইশারা করে, তখন তাঁর সঙ্গে চলার পথ কঠিন এবং বন্ধুর হলেও তুমি তাকে অনুসরণ করো। তাঁর ডানা যখন তোমাকে জড়িয়ে ধরে তখন তাঁর ডানায় লুকনো তরবারি তোমাকে আঘাত করলেও তুমি তাকে আলিঙ্গনে আত্নসমর্পণ করো। সে যখন কথা বলে, তখন তাঁর কণ্ঠস্বরে তোমার স্বপ্ন যদি উত্তরের বাতাসে তছনছ বাগানের মতো ভেঙ্গে যায়, তবু তুমি তাকে বিশ্বাস করো। কারণ ভালবাসা যেমন তোমাকে রাজমুকুটে ভূষিত করে, তেমনি সে তোমাকে ক্রশবিদ্ধ করে।

[] ভালবাসা তোমাকে নিয়ে এত কান্ড করে যাতে তুমি তোমার হৃদয়ের রহস্য জেনে যাও এবং সেই জ্ঞানে তুমি মহাজীবনের হৃদয়ের এক ক্ষুদ্র অংশ হয়ে যাও। কিন্তু তুমি যদি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তোমার ভালোবাসায় শুধুই শান্তি এবং সুখ সন্ধান করো, তাহলে তোমার জন্য শ্রেয় তোমার নগ্নতা ঢেকে নিয়ে ভালোবাসার মাড়াই-প্রাঙ্গন ছেড়ে যাওয়া, এবং ঋতু-বৈচিত্র্যহীন ভুবনে প্রবেশ করা যেখানে তুমি হয়তো হাসবে কিন্তু প্রানখুলে হাসবে না, তুমি হয়তো কাঁদবে কিন্তু প্রাণভরে কাঁদবে না।

[/] বিবাহঃ তোমরা তোমাদের হৃদয় বিনিময় কর, কিন্তু একে অপরের হাতে তা সঁপে দিও না। কারণ একমাত্র মহাজীবন তাঁর হাতে তোমাদের হৃদয় ধারণ করতে পারে।

[/] সন্তানঃ এবং তিনি বললেন, তোমার সন্তানরা তোমার সন্তান নয়। তারা জীবনের জন্য জীবনের আকুল প্রত্যাশার পুত্র-কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের ভেতরে জন্ম নেয় না। এবং তারা যদিও তোমাদের সঙ্গে থাকে তারা তোমাদের সম্পদ নয়।

[/]দানঃ [] এমন মানুষ আছে যারা দান করে আনন্দ পায়, সে আনন্দ তাদের পুরস্কার। এবং এমন মানুষ আছে যারা দান করে ব্যথিত হয়, সে বেদনায় তাদের পুণ্যস্নান। আবার এমন মানুষও আছে যারা দান করে ব্যথিত হয় না আনন্দিতও হয় না, তারা দানের মহত্ত্বও মনে রাখে না, নিকট উপত্যকায় বনের ফুল যেমন বাতাসে তাঁর সুবাস ছড়িয়ে দেয়, তারা তেমনি দান করে। বিধাতা তদের হাত দিয়েই নিজেকে প্রকাশ করেন এবং তাদের নয়ন থেকে বিশ্বে তাঁর হাসি ছড়িয়ে দেন।

[] তুমি প্রায়ই বল, যাদের প্রয়োজন আমি শুধু তাদের দেব। তোমার ফল বাগানের বৃক্ষরাজি কিংবা তোমার চারণভূমির পশুগুলো একথা বলে না। তারা যাতে টিকে থাকতে পারে সেজন্য তারা দান করে, কারণ দান-বিমুখ হলেই বিলুপ্তি। যে ব্যক্তি তাঁর দিবানিশির জীবন লাভ করার উপযুক্ত, সে নিশ্চই তোমার হাত থেকে আর সবকিছু পাওয়ার যোগ্য। যে ব্যক্তি জীবন-সমুদ্র থেকে পান করার অধিকার অর্জন করেছে, সে তোমার ক্ষুদ্র জলস্রোতে পানপাত্র ভরে নেওয়ার অধিকার ও রাখে।

[/] খাদ্য ও পানীয়ঃ [] এবং তিনি বললেন, তোমরা যদি শুধুমাত্র মাটির সুগন্ধ নিয়ে জীবন ধারণ করতে এবং বায়ুসেবী লতার মত আলো পেয়ে বেঁচে থাকতে। কিন্তু তোমাকে যখন ক্ষুধা মেটানোর জন্য হত্যা করতেই হবে এবং তৃষ্ণা নিবারণের জন্য নবজাতকের মুখ থেকে মায়ের দুধ ছিনিয়ে নিতেই হবে, তখন এ কাজগুলোও হোক উপাসনা।

[] তুমি যখন কোন প্রাণীকে হত্যা কর তখন তুমি মনে মনে তার উদ্দেশ্যে বলো, যে ক্ষমতা আজ তোমাকে হত্যা করছে সেই ক্ষমতায় আমিও নিহত হচ্ছি এবং আমিও নিঃশেষ হব। কারণ যে নিয়ম আজ তোমাকে আমার হাতে সমর্পণ করেছে সেই নিয়ম আমাকে আরও শক্তিশালী হাতে সমর্পণ করবে।

[/] কর্মঃ [] এবং তিনি বললেন, তোমরা যাতে ধরণী এবং ধরণীর আত্নার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারো, সেজন্য তোমরা কাজ কর। কেননা কর্মহীন হয়ে থাকা যেন ঋতু পরিক্রমায় নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলা এবং জীবনের যে মিছিল রাজকীয় গৌরবে নিজেকে অসীমে সমর্পণ করতে এগিয়ে চলছে সে মিছিল থেকে বের হয়ে আসা।

[] কারণ তুমি যদি অযত্নে রুটি সেঁক সে রুটি পুড়ে তিক্ত হবে এবং তাতে ক্ষুধার অর্ধেক মাত্র মিটবে। এবং তুমি যদি বিরক্ত হয়ে আঙ্গুর পেষণ কর তবে তোমার বিরক্তি বিষের ফোঁটা হয়ে মদিরায় মিশবে।

[/] সুখ-দুঃখঃ  তোমার সুখ তোমার দুঃখের ছদ্মবেশ বর্জিত রূপ। যে কূপ থেকে তোমার হাসি উঠে আসে সেই কূপ প্রায়ই তোমার দুঃখের অশ্রুতে ভরা থাকে। তাছাড়া আর কী হতে পারে? সেই দুঃখের আঘাতে তোমার অন্তরের ক্ষত যত গভীর হয় তত বেশি সুখ তুমি ধরে রাখতে পার। কারণ যে পানপাত্র তোমার মদিরা ধারণ করে তা কি কুমোরের চুল্লিতে পোড়ানো সেই পানপাত্র নয়? এবং যে বীণার তানে তোমার চিত্ত প্রশান্ত হয় তা কি ছুরির ঘায়ে খোদাই হওয়া সেই কাঠের গুড়ি নয়?

[/] গৃহঃ তোমাদের গৃহ কোনো নোঙ্গর হবে না বরং হবে এক মাস্তুল। সে গৃহ এক চকচকে আবরণী হয়ে ক্ষত ঢেকে রাখবে না, বরং তা চোখের পাতা হয়ে চোখ রক্ষা করবে। তোমরা তোমাদের ডানা গুটিয়ে নিয়ে সে গৃহে প্রবেশ করবে না, তোমরা সে গৃহের ছাদে মাথা ঠেকার আশঙ্কায় মাথা নত করে চলবে না, তোমরা সে গৃহের দেয়ালে ফাটল ধরে ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে নিঃশ্বাস ফেলতে শঙ্কিত হবে না।

[/] ক্রয়-বিক্রয়ঃ [] এক বণিক বলল, তুমি ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কে আমাদের বলো। এবং তিনি বললেন, ধরণী তোমাদের জন্য তাঁর ফসল ফলায়, তোমরা যদি দুহাত ভরে নেওয়ার উপায় জেনে নাও, তোমাদের অভাব থাকবে না। ধরণীর উপহারগুলো বিনিময় করলেই তোমরা প্রাচুর্য পাবে এবং তুষ্ট হবে। তবে এ আদান-প্রদান ভালোবাসা এবং সদয় সুবিচারের সঙ্গে সম্পন্ন না হলে কেউ কেউ হবে লোভ-উন্মত্ত এবং অন্যরা থাকবে অভুক্ত।

[] তোমরা হাঁট ছেড়ে যাবার আগে কেউ শূন্য হাতে হাঁট থেকে ফিরে গেল কি না তা দেখে নাও। কারণ যে মানুষটি সবার মাঝে অধম, তাঁর প্রয়োজনও না মেটা পর্যন্ত ধরণীর আত্না শান্তিতে বাতাসে সুপ্ত হয় না।

[/] অপরাধ ও শাস্তিঃ তোমার চেতনা যখন বাতাসে ভেসে বেড়াতে যায়, তখন সঙ্গীহারা এবং অরক্ষিত সেই তুমি অপরের প্রতি অন্যায় কর, তার ফলে তুমি অন্যায় কর নিজের প্রতি। সে অন্যায়ের কারণে তুমি সাড়াবঞ্চিত হয়ে আশীর্বাদপ্রাপ্তদের দ্বারে কিছুকাল অপেক্ষা করবে।

[/] যুক্তি ও আবেগঃ যুক্তি আবেগকে তুমি তোমার গৃহে দুই প্রিয় অতিথির মতো গণ্য কর। তুমি নিশ্চই একজনকে অপরজন থেকে বেশি সম্মান দেখাবে না। কারণ যে ব্যক্তি একজনের প্রতি বেশি যত্নশীল হয়, সে উভয়ের ভালোবাসা এবং বিশ্বাস হারায়।

[/] বেদনাঃ [] যে খোলস তোমার উপলব্দিকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে তা ভেঙ্গে যাওয়াই তোমার বেদনা। ফলের হৃদয়কে সূর্যালোকে বের করে আনতে হলে তার আঁটিকে যেমন ভেঙ্গে যেতেই হবে তেমনি তোমাদেরকেও বেদনার অনুভূতি লাভ করতেই হবে।

[] এবং তোমরা যেমন ফসলের মাঠে বিভিন্ন ঋতুর আবির্ভাব সর্বদা মেনে নাও, তেমনি তোমরা তোমাদের হৃদয়ের ঋতু বৈচিত্র্যকেও মেনে নেবে।

[/] বন্ধুত্বঃ হাস্য কলরবে এবং পরস্পরে আনন্দ ভাগাভাগি করে বন্ধুত্ব মধুর হোক। কারণ এই ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর বিন্দু বিন্দু শিশিরে হৃদয় তার প্রভাত খুঁজে পায় এবং সতেজ হয়।

[/] ভালো-মন্দঃ [] আমি তোমাদের ভালো সম্পর্কে বলতে পারি কিন্তু মন্দ সম্পর্কে বলব না। কারণ মন্দ, আপন ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় পীড়িত ভালো ছাড়া আর কী?

[] তুমি অসংখ্য বিবেচনায় ভালো এবং তুমি যখন ভালো নও তখন মন্দ ও নয়। তুমি শুধু আলস্যে মন্থর হয়ে দিশা হারিয়েছ। কিন্তু হায়, হরিণ কচ্ছপকে ক্ষিপ্ততা শিক্ষা দিতে পারে না।

[] প্রকৃত ভালো মানুষ বস্ত্রহীন মানুষকে ‘তোমার পোশাক কোথায়?’-এ প্রশ্ন করে না। কিংবা গৃহহীন মানুষকে ‘তোমার ঘরের কী হয়েছে?’- এ প্রশ্ন করে না।

[/] ভোগ-সুখঃ [] এবং তোমার দেহ তোমার আত্নার বীণা। এবং তুমি তাতে সুমধুর সুর না শ্রুতিকটূ শব্দ তুলবে সে দ্বায়িত্ব তোমার।

[] তোমরা তোমাদের ফসলের মাঠে কিংবা বাগানে যাও, সেখানে তোমরা জানবে, ফুল থেকে মধু পান করাটা মৌমাছির সুখ। কিন্তু মৌমাছিকে তাঁর মধু দান করে ফুলের ও সুখ। কারণ মৌমাছির জন্য প্রতিটি ফুল প্রাণের এক ঝরনাধারা। এবং ফুলের জন্য প্রতিটি মৌমাছি প্রণয়ের এক দূত। এবং মৌমাছি ও ফুল উভয়ের জন্য সুখ আদান-প্রদান এক প্রয়োজন এবং পরম আনন্দ। ওরফেলিসের জনগণ, সুখ ভোগের বেলায় তোমরাও মৌমাছি ও ফুলের মতো হও।

লেখাটা খুব বেশি বড় হয়ে গেল মনে হচ্ছে, দেখি সময় পেলে পুরো বইটা আবার পড়তে হবে।

Facebook Comments

Author: Neoman Nasir

I am Neoman Nasir. Studied Applied Mathematics at Noakhali Science and Technology University.

Leave a Reply